খিচুড়ি কাব্য ও ঝন্টু দা

ঝন্টু দা। লিকলিকে ঝন্টু দা। রোগা-পাতলা ঝন্টু দা। কর্তৃত্বপরায়ণ, প্রশংসা প্রিয় ঝন্টু দা। আমার মেস জীবনের বড় ভাই ঝন্টু দা।

ঝন্টু দা’র সাথে আমার পরিচয় হয় একই মেসে থাকার সুবাদে। বেশ মিশুক, দায়িত্ববান, পরোপকারি অমায়িক ব্যবহারের অধিকারী ঝন্টু দা। ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে মোট পাঁচজন ব্যাচেলরের মেস জীবন বাস। ঝন্টু দা সবার সিনিয়র। বাকি সবাই সমবয়সী। মূলত আমরা পেশায় ছাত্র। 😊

ঝন্টু দা আজীবন নির্বাচিত মেস ম্যানেজার। আর প্রতিমাসে আমাদের মধ্য থেকে একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি। ঝন্টু দা’র সহায়ক। একনিষ্ঠ আজ্ঞাবাহক। হিসেবে ভুল, দায়িত্বে অবহেলা ঝন্টু দা’র এখতিয়ার বহির্ভুত।

হেলালের মা। আমাদের খালা। মেসের একমাত্র বাবুর্চি। রান্নার হাত সেই। অতিকষ্টে খানা গলা দিয়ে চালান করতে হয়। উপায় নেই। অভিজ্ঞতা বলে খালাদের রান্না এমনই হয়। দুইবেলা রান্না। সকাল আর বিকেল। সাথে ঘর পরিস্কার করা। খালার মর্জি মতো যখন তখন ছুটি। প্রতিবাদ করার ভাষা আমাদের নেই। একটু-আধটু প্রতিবাদ যে করিনি তা-ও না। করেছি। কিন্তু ছুটির মাত্রাটা এতে আরও বেড়ে যায়। উপায় নেই। অভিজ্ঞতা বলে খালারা এমনই হয়। 😕

নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রতিদিন ভোরে হকার মারফত ‘প্রথম-আলো’ পত্রিকা দরজার ফাঁক দিয়ে মেসে পৌঁছে যায়। ‘প্রথম-আলো’ রাখার একটাই কারণ। বিজ্ঞাপণ বেশি। আমাদের খবর পড়ার সময় কই! মোবাইল অপারেটরদের দেওয়া অফার আর খেলার আপডেট জানা। এজন্যই তো পত্রিকা! ভুল বললাম। আরও একটি পাতার পাঠক আছেন। ‘বিনোদন পাতা’। একমাত্র পাঠক, নীরব পাঠক ঝন্টু দা। 😋

সেদিন ভোরে মেসতান্ত্রিক নিয়মে খালার রান্না করা গরম ভাত সাথে ডাল আর আলু ভর্তা। আজ একসাথে দুপুরের রান্না করতে পারবেন না। খালার আত্মীয় অসুস্থ। দেখতে যাবেন। একটা কি দেড়টার দিকে এসে দুপুর আর রাতের রান্না একসাথে করবেন। কিছু টাকা পয়সা হয়তো চাইতেন। কিন্তু আজ মাসের ৩০ তারিখ হওয়ায় বৃথা বাক্য অপচয় করেন নি। আমাদের সবার পকেটও গড়ের মাঠ। আশায় রইলাম খালা আসবেন। ঘড়ির ছোট কাঁটা দুইয়ের ঘর ছুঁয়েছে মিনিট পাঁচেক হলো। এখনও আশায় রইলাম খালা আসবেন। কথায় বলে “আশায় বাঁচে চাষা”। তিন, চার। ঘড়ির কাঁটার অবস্থান বদলায়। আর আমাদের আশার রঙও বদলায়।

নিরাশার সম্বল ঝন্টু দা সেই সকাল থেকেই মেসে নেই। এমনটা সচারচার হয় না। ভাগ্যলক্ষ্মী বোধ হয় আজ আমাদের সাথে মশকরা করছেন। খালার অবর্তমানে রন্ধনশালার এই গুরুদায়িত্ব ঝন্টু দা-ই সামলান। আজ ঝন্টু দা নেই। কারো পকেটে টাকাও নেই। পেটে দানা নেই। পানি খেয়ে আর কতো! আশায় রইলাম ঝন্টু দা আসবেন। ঝন্টু দা এলেন। সময় বলছে রাত এগারোটা। ততোক্ষণে আমরা ক্ষুধায় কাহিল।

অবশেষে ঝন্টু দা’র মেসে না থাকার কারণ জানা গেলো। কে যেন পত্রিকার টুকলি কাঁটায় তাঁর প্রিয় ‘বিনোদন পাতা’র খবর পড়তে পারেন নি। তাই মনের দুঃখে পাবলিক লাইব্রেরিতে গিয়েছিলেন পত্রিকা পড়তে। ভুল বললাম। বিনোদন পাতা পড়তে। কিন্তু তাঁর বিধি বাম। প্রিয় পত্রিকার নাগাল পাওয়ার আগেই ঘুমদেবী তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। লাইব্রেরিয়ানের ডাকে যখন ঘুম ভাঙে তখন বিকেল পাঁচটা পাঁচ। ক্ষোভ আর ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বের হয়ে পকেটে থাকা ২০ টাকায় রুটি আর কলা দিয়েই সেরে ফেলেছেন লাঞ্চ। স্যরি, লেট লাঞ্চ। শরীরে হাওয়া বাতাস লাগিয়ে ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা।

আমরা অনাহারে। অভিভাবক ঝন্টু দা কাপড় পাল্টেই রান্না ঘরে ঢুকবেন। হাতের কাছে যা পাবেন তাই দিয়ে রান্না সারবেন। এই না হলে আমাদের ঝন্টু দা! সবার প্রিয় পাচোক ঝন্টু দা। কিন্তু এখানেও বিধি বাম। ঝন্টু দা কাপড় পাল্টাতেই ঘরের আলোও পাল্টে গেলো। লোডশেডিং। এক ঘণ্টার লোডশেডিং। কুক্ষণের ঝন্টু দা! কুফা ঝন্টু দা! হতচ্ছাড়া কপাল পোড়া ঝন্টু দা!

আমরা যে তাকে কপাল পোড়া ভাবছি তা মনে হয় সে অনুমাণ করতে পারলো। নিজেই বললো “কারো কাছে মোম থাকলে নিয়ে আয়। মোমবাতির আলোতেই রান্না সারি। বেশি কিছু করার সময় নেই। শুধু খিচুড়ি পাকাবো।” আমাদের খুশি আর দেখে কে! চটজলদি মোম জ্বেলে আলোর ব্যবস্থা করলাম। আধঘণ্টার মধ্যেই রান্না শেষ। চাল ডালের খিচুরি। আমরা আর অপেক্ষা করলাম না। হুড়োহুড়ি করে খিচুরি নিয়ে গোগ্রাসে গিলতে লাগলাম। আহা কি স্বাদ! সাথে মাংসের ঘ্রাণও আসছে।

- ঝন্টু দা তুমি মাংস পেলে কোথায়?
-- মাংস আর পাবো কই?
- খিচুড়ি থেকে যে মাংসের ঘ্রাণ আসছে? আর স্বাদটাও সেই হইছে!
-- আরে নাহ্! দু’টো রসুন থেঁতলে দিয়েছি মাত্র! (ঝন্টু দা’র মুখে তৃপ্তির হাসি। অর্জনের গর্ব ভরা হাসি।)

মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আমাদের খাওয়া শেষ। বাকি রইলেন ঝন্টু দা। বিদ্যুৎ এলে খাবেন। আমরা ঝন্টু দা’র প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ঝন্টু দা’র লাজুক হাসি। পরম অহংবোধ হাসি। সর্বেসর্বা হাসি।

অবশেষে ঘণ্টাখানেক বাদে বিদ্যুৎ এলো। ঝন্টু দা-ও আর অপেক্ষা করবেন না। একটি প্লেটে খিচুড়ি নিয়ে আমাদের কাছে এলেন। আমাদের অবাক চাহনি!

- ঝন্টু দা তোমার প্লেটে ছোচের মতো ওইটা কী দেখা যায়!
-- (ঝন্টু দা কিছুটা অবাক হয়ে) মনে হয় রসুন থেঁতলানোর সময় রসুনের গোড়া পড়ছে।
- কিন্তু রসুনের গোড়ার ছোচ তো সাদা হওয়ার কথা! এটা কালো কেন?

ঝন্টু দা ছোচ ধরে টেনে বের করতেই আবিষ্কার হল থেতলে যাওয়া অর্ধসিদ্ধ নেংটি ইঁদুর। ঝন্টু দা’র চোপসানো মুখ আর আমাদের ‘ওয়াক’ ‘ওয়াক’। কিন্তু সারাদিন অভুক্তের পেট থেকে কি আর কিছু বের হয়?

No comments:

Powered by Blogger.